প্রিয় সাকুরা,
তোমার দিনরাত্রি শেষ হয়েছে সেই বসন্তেই। এখন ডিসেম্বর। শীত এসে কড়া নাড়ছে বেশ কদিন থেকেই। এইতো সেদিন খানিকটা তুষারও পড়ল। আমি তখন অফিসের ব্যস্ততায়। তবুও খানিকটা উঁকি মেরে দেখতে পেয়েছিলাম। তুষার আমার বরাবরই ভালো লাগে তুমি জানো। কিন্তু তুমি যেটা জানো না তা হলো আজকাল তুষার দেখলেই আমার হাত পা অসাড় হয়ে আসতে শুরু করে। মনে হয় আমি দাঁড়িয়ে আছি কোন এক নাম না জানা স্টেশনে। তুষার ঝরে যাচ্ছে নিঃশব্দে। হঠাৎ কুয়াশার মধ্য থেকে বেড়িয়ে এলে তুমি। পরক্ষনেই মিলিয়ে গেলে ট্রামে চড়ে। আমার ট্রামে ওঠার কোন শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। সবকিছু কেন যেন অসাড় হয়ে আসে। আমার দুঃখ লাগতে থাকে।
আমার একটা অদ্ভুত বিশ্বাস আছে জানো— আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষ আসলে গোপনে দুঃখের আরাধনা করে। একদম শুরুর কথা যদি বলি, সেই কৈশোরের প্রথম প্রেম, খুব ইম্পালসিভ কিছু সিদ্ধান্ত। একদিন সব চুকেবুকে গেল। আমার ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গেল ঠিকই, কিন্তু সেই তীব্র কষ্টের মাঝে আমি এক আশ্চর্য আনন্দ খুঁজে পেলাম। দুঃখবিলাসের এক অদ্ভুত নেশায় বুঁদ হয়ে গেলাম আমি, আর সেই নেশা ক্রমশ গাঢ় হতে থাকল।
এরপর জীবনের খাতায় অনেকগুলো বসন্তের হিসেব জমা হয়েছে। একদিন আমি আবারও দুঃখ পেলাম। আগেরবার কষ্টটা ছিল হারানোর, যদিও স্বেচ্ছায় হারিয়েছিলাম; তবুও দুঃখটা তাতে কিছু কম হয়নি। আর এবারের দুঃখটা হলো না পাওয়ার। ঠিক কী পাইনি, আমি নিজেও জানি না। আমি তো বলেছিলামই পাওয়ার আশা করলেই আমার ঘোরটুকু নষ্ট হয়ে যাবে। তাও চেয়েছিলাম। তাই এবারে দুঃখটা কোথা থেকে জন্ম নিলো আমি তা কখনোই বলতে পারব না।
কিন্তু একদিন হুট করে এই সব দুঃখগুলো মিটে গিয়েছিলো, জানো? শুভ্র হিম তুষার আমার শরীর থেকে সব দুঃখ মুছে দিয়েছিলো বোধহয়। বাসায় ফিরে মরার মত ঘুমালাম। পরদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার দুঃখ করার মত আর কিছু বাকি নাই। এই দুঃখ চলে যাওয়ার ব্যাপারটা ভয়ঙ্কর। বোধহয় আমি তোমাকে বলেছি। শুধু তোমাকে না, আর অনেককে বলেছি, আমি নিজের জীবন নিয়ে খুবই স্যাটিস্ফাইড একজন মানুষ। মিথ্যা বলিনি জানো? যার কোন দুঃখ নাই সে স্যাটিস্ফাইড হবে না তো কে হবে? আমি স্যাটিস্ফাইড ছিলাম। অনেক স্যাটিস্ফাইড ছিলাম। এই স্যাটিস্ফিকশনটা ভয়ঙ্কর। আমার কাছে মনে হতে শুরু করেছিল বেঁচে থাকার আর কোন প্রয়োজন নাই। যার জীবনে কোন দুঃখ নাই সে মহানন্দে মারা যেতে পারে। আমার মৃত্যুবাসনা প্রকট হয়ে উঠছিলো।
আমি বোধহয় হারায় ফেলেছি, কী লেখার কথা ছিল আর কী লিখছি। এখন আর কোন নিয়ন্ত্রণ নাই।
আজ সারাদিন খুব বৃষ্টি হয়েছে। ভেবেছিলাম ক্রিসমাস মার্কেটে যাবো। বৃষ্টিতে বের হতে ইচ্ছা করেনি। সারাদিন জানালায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। প্রতি বছরেরই এই সময়ের আবহাওয়াটা কেমন যেন। যদি জিজ্ঞেস করো কেমন তবে আমি বলতে পারবো না। কোন রোদ নেই, বাতাস নেই। কেবল গুমোট বাঁধা শূন্যতা। যেন শূন্যতার এক শোকসভায় মিছিল করে যোগ দিতে যাচ্ছে একদল ধোঁয়াশা আর তার মাঝে দাঁড়িয়ে আমি।
সব ছেড়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করে। সেই পুরনো পালিয়ে যাওয়া স্বভাব— যে কারণে তোমার কাছে আসতে খুব ভয় পেয়েছি আমি সবসময়। তবু কীভাবে কীভাবে যেন কাছে চলে এসেছি! অদ্ভূত না? হয়ত না। মনে মনে তোমাকে চাইছিলাম আমি। কতোখানি চাইছিলাম সে আমি দু’টো শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করবার ক্ষমতা রাখি না। সৃষ্টিকর্তা আমাকে ভাষা দিয়েছেন বটে কিন্তু সেই ভাষার করতলে শূন্য এক চাহনিও দিয়ে দিয়েছেন। তোমাকে নিয়ে আমি যখনই লিখতে চাই কেবল সেই শূন্য চাহনি ফুটে ওঠে।
আমি শূণ্য জানালায় তাকিয়ে থাকি। চায়ের পেয়ালায় চুমুক দেই। চিনি ছাড়া বিস্বাদ চা। সিগারেট ক’টা গেলো হিসেব রাখা হয়নি। খালি পেটে সিগারেট নামতে চায় না। বাসার ওভেনে ভাত তখন বাড়ন্ত। ঝুম ঝুম বৃষ্টি নামে। দুঃখ জাগে।
অদ্ভূত সব দুঃখ জানো? আমার দুঃখ এই যে এতোকিছু হয়ে গেলো অথচ তুমি নাই। আসলে আছো। আমি জানি তুমি আমার। তবু তোমাকেই চাই। চাইতেই থাকব। পেয়ে গেলেও চাইব। পাওয়া শেষ মানে দুঃখ শেষ। তোমাকে কি করে শেষ হতে দেব আমি? কি করে দুঃখকে শেষ হতে দেব? তুমি আমার দুঃখ নও। কিন্তু আমি তোমাকে পেতে ভালোবাসি।
—৮ই পৌষ, ১৪৩১

