মূল বিষয়ে যান

“নক্ষত্রেরা চুরি করে নিয়ে গেছে, ফিরিয়ে দেবে না তাকে আর”

·3 মিনিট

গত কয়েক বছর ধরে একটা অক্ষমতার যন্ত্রণা প্রায়শই মাথার মধ্যে এক অশান্তির ঝড় তোলে- কিছু একটা লিখতে না পারার অক্ষমতা। লেখক আমি কখনোই ছিলাম না বোধ করি। যা লিখেছি, তা-ও ভ্রমণের পথে পাওয়া আবোল-তাবোল কিছু স্মৃতি মাত্র। এছাড়া দেশ ছাড়ার পূর্বে জীবনটা রঙিন ও ঘটনাবহুল ছিল। মানুষের সঙ্গে প্রতিদিনের মেলামেশা ছিল, যাপিত জীবনের নিয়মে ভিন্নতা ছিল। দেশান্তরের পর জীবনটা যেন ছকে বাঁধা, নিস্তরঙ্গ। এই একঘেয়েমিই আমার লেখার জগৎ শূন্য করে দিয়েছে।

এর সাথে গত কয়েক মাস ধরে মনে হচ্ছে আমি ঠিকমতো ভাবতেও পারছি না, কিংবা ভাবনাগুলো গুছিয়ে নিতে পারছি না। দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে মস্তিষ্কের নিউরন আর সিন্যাপ্স যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, এক অচেনা জড়তায় আচ্ছন্ন। ভাবতে গেলেই শব্দগুলো মাথার মধ্যে জট পাকিয়ে যায়, অগণিত ভাবনারা একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে যায়। সে ভাবনা লেখা তো আরও শক্ত কাজ। চিন্তা করাও বোধ করি শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মত; অনভ্যাসে, অব্যবহারে ভাবনা-চিন্তার ক্ষমতায়ও মরচে পড়ে যায়। না লিখতে লিখতে, না ভাবতে ভাবতে, আমি যেন আর আগের মতো নিজেকে অনুবাদ করতে পারি না- শব্দে প্রকাশ করতে পারি না। লিখতে আগেও পারতাম না বিশেষ, এখন ভাবতে পারি না।

মানুষ বোধহয় কোনো কিছু হারানোর আগ পর্যন্ত বুঝতেই পারে না, কী ছিল তার কাছে। কিন্তু কী নেই- তার অনুপস্থিতি কিন্তু সবসময়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেটা বোঝার জন্য বাড়তি চেষ্টার দরকার হয় না। অক্ষমতা এক অদৃশ্য ছায়ার মতো সামনে ঝুলে থাকে- অপরিবর্তনীয়, অনিবার্য ভবিতব্যের মতন; সস্তা অ্যাপের একগুঁয়ে নোটিফিকেশনের মতন; ফ্রি ইউটিউবের আন্সকিপেবল অ্যাডের মত। যা চোখ সরালেও থেকে যায়, চাইলেও যাকে মুছে ফেলা যায় না।

মানুষ ইচ্ছার বিরুদ্ধে কতটুকুই বা করতে পারে? বিশেষত সেই সব কাজে, যাদের কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য বা সময়সীমা নেই? কিছু কাপড় থাকে না যে একবার পরা হয়েছে, আরও অন্তত একবার না পরে ধুয়ে দেওয়ার শ্রান্তিটুকু অর্থহীন মনে হয়, আবার এতটাও পরিষ্কার নয় যে ভাঁজ করে আলমারিতে তুলে রাখা যায়? তারাই তো চেয়ার বা বিছানার কোণে গড়ে তোলে এক নিঃশব্দ, অগোছালো সাম্রাজ্য।

একই ভাবে হাজার হাজার ডেডলাইনের ক্যাকাফোনিতে আমাদের এইসব ঐচ্ছিক ভালোবাসার কাজগুলো নীরব দর্শক হয়ে জমে ওঠে স্তূপাকারে। অবহেলায় জমতে জমতে তারা যেন আমাদেরই দেওয়া অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির সমাধিস্তুপ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা নিজেদের এই বলে সান্ত্বনা দিই- একদিন যত্ন করে এই সব আবছা হয়ে যাওয়া ইচ্ছেগুলোকে আবার জাগিয়ে তুলবো।

মানুষ-বিবর্জিত, আমার এই নেক্রপলিসের জীবন যেন হাসপাতালের এক স্টেরাইল ঘরের মতো—নিঃশব্দ, নিঃসঙ্গ কিন্তু নিখুঁত, পরিপাটি। এখানে প্রাণের কোলাহল নেই, আছে কেবলই এক বর্ণহীন, গন্ধহীন পরিচ্ছন্নতা। এখানে দৈনন্দিন জীবনে একটা অপরিচিত গাছ দেখে থেমে দাঁড়াই না, ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে নাম না জানা পাখির অণ্বেষণ করি না, পথের পাশে ফুটে থাকা ঘাসফুলের জন্য কোনো মমতা অনুভব করি না। মানুষের মুখ এখন কেবলই কতগুলো রেখার সমষ্টি, তাদের কপালের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা গল্পের পাঠোদ্ধার করার স্পৃহা মরে গেছে কবেই।

টিএসসির সেই সহস্র কোলাহলের মাঝে এক কাপ চায়ের শান্তি, কিংবা গভীর রাতে রমনায়, বেইলী রোডে উদ্দেশ্যহীন হেঁটে যাওয়ায় নিজেকে খুঁজে পাওয়ার সেই রাতেরা- সবই যেন জীবন-পুঁথি থেকে নির্বাসিত এক অধ্যায়। কিংবা সামনের বর্ষায় লুং ফে ভা’র পরিকল্পনা, শীতের চাদরে চর কুকরি-মুকরির ক্যাম্পিং কবেই যেন জীবন থেকে খসে পড়েছে নিঃশব্দে, যেমন করে সবার অলক্ষ্যে ঝরে যায় হেমন্তের শেষ পাতাটি, কোনো শোক বা স্মৃতিচিহ্ন না রেখেই। আমার ভাবতেও ইচ্ছা করে না, লিখতেও ইচ্ছা করে না।


সোয়াইব
লেখক
সোয়াইব