আবহাওয়াটা সকাল থেকেই মেঘলা। থেমে থেমে বৃষ্টিও হয়েছে কয়েক পশলা। পুরো ভ্রমনটাই যে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পার করতে হবে সে ভোরে বাস থেকে নেমেই বুঝতে পেরেছিলাম। সারারাত অঝোর বৃষ্টির পরে মাত্র এক বা দেড় ঘন্টার মধ্যে বৃষ্টিটা যে থেমেছে তা রাস্তার দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারা যায়। তাতে আমার বিশেষ আফসোস হচ্ছে না। পাহাড়ে বৃষ্টির মত অপূর্ব কোন দৃশ্য দুনিয়াতে আছে বলে তো আমার মনে হয় না।
বৃষ্টি থেমেছে ঠিকই। কিন্তু চারিদিকে মেঘ আর কুয়াশায় ঢেকে আছে। এখন ভোর ছটা। অন্ধকার এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এমনই মৃদু অন্ধকারে মেঘের আচ্ছাদন দেখে মনে হয় পুরো ব্লেড শহর ও ব্লেড লেক যেন পাতলা মশারী টাঙিয়ে এখনও ঘুমিয়ে আছে।
আজ চব্বিশে জুন। কেমনিটজে বেশ গরমও পড়েছে গত কয়েকদিন ধরে। এমন ভ্যাপসা গরমে থিসিসের কাজকর্মে মন বসানোই দায় হয়ে উঠেছিল। গত কয়েকদিন ধরেই ভাবছিলাম একটা হিল স্টেশনে গিয়ে শরীরটাকে একটু ফুরফুরে করে নিতে পারলে পড়াশোনায় আবার একটু মনোযোগ আসতো। সে ভাবনার সুতো শেষমেষ গতকাল রাতে ছিড়েই গেল। গুগল ম্যাপে মার্ক করে রাখা সবগুলো পাহাড়ি শহরের মধ্যে এই ব্লেড শহরটিকেই খরচ ও সময়ের দিক থেকে সবচেয়ে রিজনেবল আর সাশ্রয়ী মনে হলো। আর কিছু না হোক, এই গরমে ব্লেড লেকে নরমে শরীর ডুবিয়ে থাকলেও হয়ত কিছুটা প্রশান্তি আসবে।
সকালে পৌঁছালেও হোস্টেলে চেক-ইনের নিয়ম দুপুর দুটোর পর। অগত্যা ব্যাকপ্যাকটা হোস্টেলের কাউন্টারে জিম্মায় রেখে ঠিক করলাম অপেক্ষার সময়টা নষ্ট না করে ভিন্টগার গর্জটা দেখে আসি। পথে থেমে থেমে বৃষ্টি পড়েছে— কখনো হালকা, কখনো একটু জোরে। পাহাড়ি পথ, কাঠের সাঁকো, নিচে ছুটে চলা নীল জল— সব মিলিয়ে ভিন্টগার নিজের মতো করেই গল্প রচনা করছিলো। কিন্তু সে গল্প আজকের নয়। সে আরেকদিন হবে।
দুপুরের পর যখন ফিরলাম, তখনো আকাশ কালো করে থেমে থেমে বৃষ্টি ঝরছে। শরীরে ক্লান্তি জমে উঠছিল। চেক-ইন সেরে ব্যাকপ্যাক তুলে নিয়ে ঘরে ঢুকলাম। বিকেলের দিকটা আর কোথাও ছোটা হলো না। অলস সময়টা লেকের পাড়েই কাটিয়ে দিলাম। খুব বেশি কিছু না, শুধু শান্ত জলের দিকে তাকিয়ে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, পাহাড় আর লেক মিলে বুঝি আজও নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে।
সন্ধ্যার আগেই ফিরে এলাম হোস্টেলে। কাল পঁচিশে জুন, স্লোভেনিয়ার ‘স্টেটহুড ডে’। যুগোস্লাভিয়া থেকে স্বাধীন হওয়ার দিন। কাল পাবলিক হলিডে, তাই দোকানপাট সব বন্ধ থাকবে। সেই কথা মাথায় রেখে আগেভাগেই টুকটাক গ্রোসারি সেরে নিলাম।
হোস্টেলটা সেদিন বেশ ভরা। ডেনমার্ক, আয়ারল্যান্ড, পোল্যান্ড— নানা দেশের মানুষ। কেউ একা, কেউ দু’জনের দল। সবাই কোথাও থেকে কোথাও এসেছে, আবার কোথাও না কোথাও যাবে। এইসব জায়গায় মানুষের গল্পগুলো অদ্ভুতভাবে পাশাপাশি বসে থাকে— কেউ কারও পুরোটা জানে না, তবু একই টেবিলে চা খায়। আর আমি মানুষ দেখলেই মানুষটিকে ঘিরে একটা গল্প বানাতে চেষ্টা করি।
রাত বাড়ার সাথে সাথে হোস্টেলের কমন কিচেনটা যেন এক টুকরো পৃথিবী হয়ে উঠল। এক টেবিলে বসেছে ডেনমার্কের এক দম্পতি, আমি যেখানে বসেছি সে টেবিলে আছে আয়ারল্যান্ড থেকে আসা এক সোলো-ট্রাভেলার, আর পোল্যান্ড থেকে আসা ছটফটে একটি ছেলে। বাইরে আবার বৃষ্টি পড়ছে। ভেতরে আলো নরম, ইনডাকশন স্টোভে কেউ রাতের খাবার বানাচ্ছে, কেউ পুরোনো কফি মেশিনটার সদ্ব্যবহার করেছে। বাকি সবাই যে যার মতো বসে আছে— কেউ চুপ, কেউ আধাখানা কথায়। বাইরে অঝোর বৃষ্টি, আর ভেতরে কফির মিষ্টি গন্ধ— আড্ডা জমতে খুব বেশি সময় লাগল না।
খানিক বাদে আমাদের সাথে যোগ দিলেন হোস্টেলের মালকিন। ভদ্রমহিলা স্থানীয়, নামটা যতদূর মনে পড়ে ইভানা। পঞ্চাশের কোঠায় বয়স, মুখে বয়সের ভাঁজ পড়লেও চোখের দীপ্তি আর হাসিটা বড্ড আন্তরিক। তিনিই এই বাড়ি কাম হোস্টেলটা চালান, আর নিজেও এখানেই থাকেন। কথা ঘুরে ঘুরে পাহাড়ে এসে পড়ল। সরাদিন কে কোন পাহাড়ে চষে বেড়িয়েছে সেসব গল্প। পাহাড়ের গল্প তুলতে এমন জায়গায় খুব বেশি উসকানি লাগে না— নিজেই উঠে আসে।
গল্পের ফাঁকে আমি জানালা দিয়ে বাইরের অস্পষ্ট পাহাড়গুলোর দিকে তাকালাম। অন্ধকারের মধ্যেও পাহাড়ের ওই বিশাল অবয়বটা কেমন যেন গা ছমছমে লাগছিল। আমি ইভানাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, এত সুন্দর এই পাহাড়, কিন্তু রাতের বেলা এর রূপটা কেমন যেন ভয়ংকর, তাই না?”
ইভানা কফিতে একটা চুমুক দিয়ে জানালার দিকে তাকালেন। তারপর একটু রহস্যময় হাসি হেসে বললেন, “পাহাড় তো শুধু পাথর আর বরফ নয়, পাহাড় হলো স্মৃতির জটাজাল। আমাদের এই জুলিয়ান আল্পসের প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে আছে কত শত বছরের পুরোনো সব গল্প। তোমরা আজ যে ট্রিগ্লাভ দেখছ, একসময় নাকি সেখানেই ছিল স্বর্গের বাগান।”
বাইরে তখন হঠাৎ বাজ পড়ল। বিদ্যুতের ঝিলিকের আলোয় ইভানার মুখটা মুহূর্তের জন্য কেমন যেন অচেনা লাগল। তিনি গলার স্বরটা নামিয়ে এনে ফিসফিস করে বললেন, “তোমরা কি জানো, এই পাহাড়ের আসল মালিক কে ছিল? সে কোনো মানুষ ছিল না। সে ছিল জলাতোরগ; সোনালী শৃঙ্গের এক ছাগল।”
আমি তখন মনে মনে ভাবছিলাম— যাক, আজ তারানাথের গল্প শোনানোর জন্য কাউকে পাসিং শো নিয়ে আসতে হলো না। পাহাড় নিজেই গল্প খুলে বসেছে।
তারপর পোল্যান্ড থেকে আসা ছেলেটা একটু অবাক হয়ে বলে উঠল— “ইউনিকর্ন?”
তিনি হেসে মাথা নাড়লেন। “না। ইউনিকর্ন না। এর শিং দুটো। আর পাহাড়ের সঙ্গে তার সম্পর্কটা অন্যরকম।”
আমরা আর কেউ কথা বলছি না। ডেনমার্ক থেকে আসা দম্পতিও এসে আমাদের টেবিলে যোগ দিলেন। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল, আর ভেতরে, সেই কমন কিচেনে— ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছিল জুলিয়ান আল্পসের এক পুরনো গল্প। এমন গল্পের লোভ কি কেউ সামলাতে পারে? পৃথিবীর সব দেশেই মনে হয় গল্প শোনার লোভ একই রকমের।
“জলাতোরগ ছিল অমর,” ইভানার গলায় তখন আদিম এক বিশ্বাস, “গুলি লাগলেও তার রক্ত থেকে জন্মাত জাদুকরী লাল ফুল ‘ট্রিগ্লাভ রোজ’। সেই ফুল খেলেই যে কেউ আবার বেঁচে উঠত। কিন্তু মানুষের লোভ… হায়! সেই লোভই তো সব শেষ করে দিল।”
ইভানা থামলো। জানালার কাঁচে তখন বৃষ্টির ছাঁট আর মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি। কিচেনের সেই আলো-আঁধারিতে বসে মনে হলো আমরা আর একবিংশ শতাব্দীর ব্লেড শহরে নেই, সময়ের স্রোত বেয়ে চলে গেছি সেই আদিম যুগে। ইভানার সেই স্লাভিক অ্যাকসেন্টে ইংরেজি বর্ণনা আর বাইরের প্রকৃতির রুদ্ররূপ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। আমি শুধু মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে গেলাম সেই পাহাড়ি উপকথা। ডায়েরির পাতায় ইভানার বলা সেই গল্পটাই নিজের ভাষায় সাজিয়ে লিখছি।
অনেক অনেক দিন আগের কথা। স্লোভেনিয়ার উত্তরে জুলিয়ান আল্পস যেখানে আকাশের গা ছুঁয়েছে, সেখানে ছিল এক মস্ত পাহাড়— নাম তার মাউন্ট ট্রিগ্লাভ। সেই পাহাড়ের চূড়া ছিল এক স্বর্গীয় বাগান। সেখানে বাস করত একদল সাদা পরী, যাদের বলা হতো ‘হোয়াইট লেডিস’ বা শ্বেতপরী। তারা ছিল পাহাড়ের ভাগ্যরক্ষক। তারা গোপনে নেমে আসত উপত্যকায়; গরিব মানুষের পাশে দাঁড়াত, প্রসবযন্ত্রণায় থাকা নারীর কপালে আশীর্বাদের হাত রাখত, রাখালদের শেখাত কোন ঘাসে ওষুধ, কোন ফুলে প্রাণ। কিন্তু কেউ যদি লোভ নিয়ে তাদের বাসভূমির দিকে এগোত পাহাড় তখন রেগে যেত। পাথর গড়িয়ে পড়ত, ঝড় নামত, পথ হারিয়ে ফেলত মানুষ।
কিন্তু এই জাদুকরী বাগানের আসল প্রহরী ছিল এক অদ্ভুত প্রাণী। তার নাম ‘জলাতোরগ’ (Zlatorog)। সে ছিল এক ধবধবে সাদা পাহাড়ি চ্যাময় (এক ধরণের বুনো ছাগল), যার মাথায় ছিল একজোড়া ঝকঝকে সোনার শিং। জলাতোরগ ছিল অমর। কেউ যদি তাকে তীর বা গুলি দিয়ে আঘাত করত, তবে তার শরীর থেকে ঝরে পড়া রক্তের ফোঁটা মাটিতে পড়া মাত্রই সেখানে ফুটে উঠত এক অলৌকিক লাল ফুল—‘ট্রিগ্লাভ রোজ’। আহত জলাতোরগ সেই ফুল খেলে নিমেষেই তার সব ক্ষত সেরে যেত, সে ফিরে পেত নতুন জীবন।
লোকমুখে শোনা যেত, জলাতোরগের ওই সোনার শিং হলো পাহাড়ের নিচে লুকানো অঢেল গুপ্তধনের চাবি। এক বহু-মাথাওয়ালা সাপ সেই গুপ্তধন পাহারা দিত। মানুষের বিশ্বাস ছিল, যে জলাতোরগের শিং দখল করতে পারবে, সেই হবে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদের মালিক।
সেই পাহাড়ের নিচেই ত্রেন্তা উপত্যকায় বাস করত এক তরুণ শিকারী। সে ছিল যেমন সাহসী, তেমনি সুঠাম। তার মা ছিল অন্ধ। পাহাড়েই তার বাস, পাহাড়েই তার জীবিকা। পাহাড়ের প্রতিটি অলিগলি তার চেনা। পাহাড়ও তাকে চিনত, হোয়াইট লেডিসরা তাকে রক্ষা করত। সে জানত কোন পথে হাঁটলে পাহাড় রাগ করে না। সে ভালোবাসত গ্রামের এক সরাইখানার মালিকের মেয়েকে। মেয়েটি ছিল অপরূপ সুন্দরী। শিকারী রোজ জঙ্গল থেকে দামি উপহার আর ফুল এনে মেয়েটির মন জয়ের চেষ্টা করত। তাদের ভালোবাসা ভালোই চলছিল।
কিন্তু গোল বাধল যখন একদিন ভেনিস থেকে একদল ধনী বণিক সেই গ্রামে এল। তাদের সঙ্গে ছিল রেশমি পোশাক, মখমল আর সোনার গয়না। সেই বণিকদের মধ্যে একজন মেয়েটির রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে দামী দামী উপহার দিতে লাগল। সোনার গয়নার লোভে মেয়েটির মন ঘুরে গেল।
একদিন শিকারী যখন মেয়েটির সাথে দেখা করতে গেল, মেয়েটি তাকে তাচ্ছিল্য করে বলল, “দেখো, ভেনিসের বণিকরা কত ধনী আর ভদ্র। আর তুমি? তুমি তো সামান্য এক শিকারী! তুমি পাহাড়ের সব পথ চেনো, কিন্তু আমার জন্য কখনো ওই জাদুকরী ট্রিগ্লাভ রোজ বা জলাতোরগের গুপ্তধন তো আনতে পারোনি!”
অপমানের বিষ মাখানো সেই কথাগুলো তীরের মতো বিঁধল শিকারীর বুকে। যে পাহাড়কে সে দেবতা মানত, আজ প্রেমিকার মন পেতে সেই পাহাড়কেই লুট করার সংকল্প করল সে। তার সততা ঢেকে গেল আক্রোশের কালো মেঘে। পথিমধ্যে তার দেখা হলো এক কুখ্যাত শয়তান শিকারীর সাথে, যাকে সবাই গ্রিন হান্টার নামে চেনে। গ্রিন হান্টারও তাকে উস্কানি দিল, “চলো, আমরা জলাতোরগকে হত্যা করি। তার সোনার শিং আর গুপ্তধন পেলে ওই ভেনিসীয় বণিকও তোমার কাছে ভিখারি মনে হবে।”
দুই শিকারী পাহাড়ের দুর্গম পথ বেয়ে উপরে উঠল। এক ভোরে তারা জলাতোরগকে দেখতে পেল। তরুণ শিকারী তার বন্দুক তাক করল এবং গুলি ছুড়ল। নিখুঁত নিশানা! গুলি বিদ্ধ করল জলাতোরগকে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে প্রাণীটি একটা সরু পাহাড়ের কিনারা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু হায়! যেই না জলাতোরগের শরীর থেকে রক্ত বরফের ওপর পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ফুটে উঠল সেই জাদুকরী লাল ফুল। জলাতোরগ এক কামড়ে সেই ফুল খেয়ে নিল। আর মুহূর্তের মধ্যে ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা। তার সব ক্ষত মিলিয়ে গেল, শরীরে ফিরে এল আদিম দেবতার শক্তি। সে উঠে দাঁড়াল। সূর্যের প্রথম কিরণ তখন তার সোনার শিঙে ঠিকরে পড়ছে। সেই তীব্র আলোয় মনে হলো যেন হাজারটা বিদ্যুৎ একসাথে জ্বলে উঠেছে।
সেই ভয়ংকর রূপ দেখে আর আলোর ঝলকানিতে তরুণ শিকারী দিশেহারা হয়ে গেল। ভয়ে পিছিয়ে যেতেই পা পিছলে সে পড়ে গেল হাজার ফুট গভীর খাদে। তার সঙ্গী গ্রিন হান্টার পালিয়ে গেল।
এদিকে নিচে উপত্যকায় মেয়েটি তার ভুলের মাশুল গুনতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, সোনার চেয়েও দামী ছিল তার প্রেমিকের হৃদয়। সে রোজ নদীর তীরে বসে অপেক্ষা করত। অবশেষে বসন্ত এল, পাহাড়ের বরফ গলে সোচা নদীর জল বাড়ল। একদিন সেই খরস্রোতা নদী ভাসিয়ে নিয়ে এল তরুণ শিকারীর নিথর দেহ। তার মুষ্টিবদ্ধ হাতে তখনো ধরা ছিল একটিই জিনিস। সেই দুর্লভ ট্রিগ্লাভ রোজ। মৃত্যুর মুহূর্তেও সে তার ভালোবাসার কথা ভোলেনি।
আর জলাতোরগ? মানুষের এই বিশ্বাসভঙ্গ আর লোলুপতায় সে ভীষণ ক্রুদ্ধ হলো। রাগে উন্মত্ত হয়ে সে তার সোনার শিং দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সেই স্বর্গের মতো সুন্দর বাগান তছনছ করে দিল। হোয়াইট লেডিসরাও মানুষের ওপর অভিমান করে চিরতরের জন্য সেই দেশ ত্যাগ করল। জলাতোরগ মিলিয়ে গেল তুষারঝড়ের মধ্যে, আর কখনো তাকে দেখা যায়নি।
আজও যদি কেউ জুলিয়ান আল্পসের সেই উচ্চতায় যায়, দেখবে সেখানে আর কোনো জাদুকরী বাগান নেই। পড়ে আছে শুধু ধূসর পাথর আর রুক্ষ শিলা; যেন এক অভিশপ্ত স্বর্গ। কিন্তু সোচা নদীর কলকল ধ্বনিতে কান পাতলে আজও হয়তো শোনা যায় সেই হতভাগ্য শিকারীর দীর্ঘশ্বাস, যে সোনার লোভে হারিয়েছিল তার জীবন, আর জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেল তার ভালোবাসা।
হোস্টেলের ওম ওম কিচেন থেকে যখন নিজের বাঙ্ক বেডে ফিরলাম, তখন রাত গভীর। জানালার বাইরে তাকালাম। অন্ধকারে পর্বতশ্রেণী আর দেখা যাচ্ছে না, শুধু অনুভব করা যাচ্ছে তার বিশাল অস্তিত্ব। মনে হলো, পাহাড়গুলো যেন অন্ধকারের চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে— নীরব, নিথর। যুগের পর যুগ ধরে সে দেখে আসছে মানুষের এই ভাঙা-গড়ার খেলা। মানুষ সবকিছুকে জয় করতে চায়—পাহাড়, ধন, অমরত্ব। কিন্তু প্রকৃতি কাউকে জয় করতে দেয় না। সে কেবল গল্প রেখে যায়। জলাতোরগ হয়তো আর নেই, কিন্তু তার অভিশাপ আজও বেঁচে আছে প্রতিটি পাহাড়ের প্রতিটি কণা ও ধূলিকণায় মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে, কিছু সৌন্দর্য দূর থেকে দেখাই শ্রেয়, ছুঁতে গেলেই তা মিলিয়ে যায়।
