এখানকার শীতের রিক্ততায়, ওই পাতাবিহীন কঙ্কালসার গাছগুলোর মাঝেও যেন এক হাহাকারময় সৌন্দর্য্য লুকিয়ে আছে। জানলার স্বচ্ছ কাঁচের ওপারে তাকালে মনে হয় দেওয়াল জুড়ে ঝোলানো কোনো এক বিষাদগ্রস্ত সাদাকালো ক্যানভাস। জরাজীর্ণ ধূসর গাছগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ডে ঝুলে আছে কুয়াশার এক ভারী, বেঢপ চাদর।
হঠাৎ সেই ধূসর ক্যানভাসে প্রাণের স্পন্দন নিয়ে আসে একরত্তি টিট পাখি। এ ডাল থেকে ও ডালে লাফালাফি করে বেড়াচ্ছে। প্রকৃতির এই বেরঙিন, জবুথবু ক্যানভাসে তার হলদে ডানাটুকু যেন এক ফোঁটা কাঁচা হলুদ রঙ- শীতের এই বিপুল বিষণ্ণতাকে রাঙিয়ে দেওয়ার এক তীব্র অথচ ব্যর্থ প্রচেষ্টা।
সেদিন সুপারশপ থেকে ফেরার পথে দেখি, তুষারের মোড়া রাস্তায় ডানা ভাঙা এক পাখি পড়ে আছে। হয়তো কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা লেগেছে, কিংবা হাড়কাঁপানো শীতের কামড় তাকে হার মানিয়েছে। অদূরেই ঝোপের আড়ালে ওৎ পেতে ছিল একটি বিড়াল। পাখিটা কি বুঝতে পেরেছিল আসন্ন বিপদ? এক ডানায় ভর দিয়ে একটু উঁচুতে, একটু আশ্রয়ে যাওয়ার সে কী প্রাণান্তকর চেষ্টা!
পাখিদের কি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় থাকে? ওরা কি বাতাসের গন্ধে মানুষের বা অন্য প্রাণীর অশুভ মতলব টের পায়? হয়তো পায়, হয়তো পায় না।
ইচ্ছে করছিল পাখিটাকে তুলে নিয়ে আসি। কিন্তু এ দেশে আইনের শেকল বড় কড়া; মায়া দেখালেই জরিমানার খড়গ। পাখিটার কপালে শেষমেশ কী হয়েছিল জানি না। বিড়ালটাকে সাময়িকভাবে তাড়িয়েছিলাম, কিন্তু আমি ফিরতেই সে ধূর্ত শিকারি যে আবার ফিরে এসে তার অসমাপ্ত কাজ শেষ করেনি, তা কে বলতে পারে?
আমরাও তো সবাই আসলে ওই ভাঙা ডানা নিয়ে ওড়া এক একটা পাখি। বাইরে থেকে হয়তো আমাদের জখমটা দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমরা প্রত্যেকেই একটু উঁচুতে, একটু নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের চারপাশেই হয়তো ওত পেতে আছে হতাশা কিংবা ব্যর্থতার সেই ধূর্ত বিড়ালটা। পাখিটা জানে না সে আদৌ ওই ডালে পৌঁছাতে পারবে কি না, তবু সে হাল ছাড়ছে না। জীবন বোধহয় এটাই- ফলাফল অনিশ্চিত জেনেও শেষ পর্যন্ত ডানার ঝাপটা দিয়ে যাওয়া।
পাখিরা মৃত্যুর পর কোথায় হারায়? সবাই তো আর শিকার হয় না, অপঘাতেও মরে না। যখন জরা এসে তাদের গ্রাস করে, তখন তারা কোথায় গিয়ে শেষ শয্যা পাতে? চারপাশজুড়ে এত এত উড়াউড়ি, অথচ মাটিতে তো কখনো কোনো মৃত পাখির দেহ পড়ে থাকতে দেখি না। তবে কি তারা মৃত্যুর আগেই আকাশের বিশালতায় বা মাটির গভীর গোপনতায় নিঃশব্দে লীন হয়ে যায়।
অন্তর্জালের অসীম দুনিয়ায় ডুব দিলে হয়তো এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মিলত। কিংবা আজকের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কোনো যন্ত্রমস্তিষ্ককে প্রশ্ন করলেই সে মুহূর্তের মধ্যে উগড়ে দিত একগাদা তথ্য। কিন্তু ওই যান্ত্রিক উত্তরের চেয়ে আমার এই আলস্যটুকু বেশি প্রিয়। এক অদ্ভুত মায়া আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে; পাখিটার ওই অস্তিত্বের ওপর থেকে দৃষ্টি ফেরানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হচ্ছে না।
হয়তো তারা কোথাও যায় না, কেবল ‘নাই’ হয়ে যায়। প্রকৃতি কাউকে মনে রাখে না। এই পাখিটা যদি আজ মরেও যায়, কালকের সকালটা ঠিক আজকের মতোই হবে। পৃথিবী তার নিয়মেই ঘুরবে।
আমার অস্তিত্বও এই বিশাল মহাবিশ্বের কাছে ওই নগণ্য টিট পাখিটার চেয়ে বেশি কিছু নয়। এই প্রবাসে বসে মাঝে মাঝে ভাবি- আমি নেই বলে কি পৃথিবীর কোথাও কোনো ছন্দপতন হয়েছে? ঢাকার জীবন একটুও থমকে গেছে? আমি নেই বলে কি শাহবাগের মোড়ে কি গোলাপ আর রজনীগন্ধার ঘ্রাণ ফুরিয়ে গেছে? কৃষ্ণচূড়ার নিচে কি আর কেউ অপেক্ষা করে না? হুড তোলা রিকশা করে প্রেমিক-প্রেমিকরা আজও ঠিকই ঘুরে বেড়ায়। তাদের সেই গোপন পৃথিবী আমার অনুপস্থিতির খবরও রাখে না। আমার থাকা বা না থাকায় সেই চিরচেনা দৃশ্যপটের কিছুই বদলায়নি, বদলাবেও না। সবকিছুই ভয়ংকর রকমের স্বাভাবিক। কেবল আমি আর এই পাখিটা পাড় ভেঙে হারিয়ে যাই।



