কাফকার সাথে আমার পরিচয় একদমই আকস্মিক। বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছি মাত্র। শৈশবের বইয়ের ভূত তখনো ঘাড় থেকে নামেনি। কৈশোরের তিন গোয়েন্দা আর কিশোর ক্লাসিকের রঙিন দুনিয়া ফিকে হয়ে আসছে। সে যায়গা ক্রমে দখল করে নিচ্ছে শীর্ষেন্দু-সমরেশের জগত। এমনই এক সময় এক বইয়ের আড্ডায় আচমকা এক বন্ধু বলে বসল, “অস্তিত্বের সমস্ত ধোঁয়াশা আর বিপন্নতা তো জীবনানন্দ আর কাফকাই ব্যবচ্ছেদ করে গেছেন।”
জীবনানন্দ, অর্থাৎ আমাদের জীবনবাবু— যাঁকে আমি তখন একটু একটু করে চিনছি; যার কবিতার পংক্তিতে হাঁটলে পায়ে শিশির আর গায়ে নক্ষত্রের ধুলো লাগে। কিন্তু কাফকা? কে এই আগন্তুক? তিনিও কি জীবনবাবুর মতোই কোনো কুয়াশাচ্ছন্ন প্রহেলিকা? নিছক কৌতূহলবশত অন্তর্জালের দুনিয়ায় ডুব দিলাম। আর যা পেলাম, তাতে মার্কেজের মতোই আমার সত্তা কেঁপে উঠল। মার্কেজ যেমন ‘মেটামরফোসিস’-এর প্রথম লাইন পড়ে খাট থেকে পড়ে গিয়েছিলেন, আমারও মনে হলো আমিও যেন এক অদৃশ্য বিছানা থেকে ছিটকে পড়লাম এক অদ্ভুত অবাস্তবতায়। সেই থেকে শুরু। আধো ঘুমে, আধো জাগরণে কাফকার সাথে আমার এক নীরব কথোপকথন। ঘোরগ্রস্ত মস্তিষ্কে একে একে গিলতে থাকি মেটামরফোসিস, দ্য স্ট্রোকার, কিংবা সেই দুর্ভেদ্য দ্য ক্যাসেল।
তখন আমি এক নিভৃতচারী শামুক। আমার পৃথিবী বলতে সাত ফুট বাই পাঁচ ফুটের বইয়ের সেলফঘেরা এক চারকোনা মেস। সেই দুনিয়ায়ই সন্ধান পেলাম কাফকা নামক দ্বৈতপুরুষের— যিনি একইসাথে কেরানি এবং মহাজাগতিক এক লেখক। জন্ম ও বেড়ে ওঠা চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগ শহরে। প্রাগ যে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণপিপাসুদের এক পরম তীর্থ, তা আমার তখন জানা ছিল না। আর জানা ছিল না যে, এই গ্রহের কোনো এক শুভক্ষণে সেই তীর্থের ধুলো আমার পায়েও লাগবে।
এরপর বহু বছর কেটে গেছে। মহাকালের চাকা ঘুরেছে। এক বিস্ময়কর জীবনচক্র আমাকে ছিটকে এনে ফেলেছে চেক প্রজাতন্ত্রের কোল ঘেঁষা পূর্ব জার্মানির এক ছোট্ট শহর কেমনিটজে। এখান থেকে কাফকার শহরের দূরত্ব মাত্র ঘণ্টা তিনেকের। ভৌগোলিক দূরত্ব কমেছে, কিন্তু মনের দূরত্ব? নতুন দেশ, নতুন ভাষা আর মানিয়ে নেয়ার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে পুরনো কাফকা স্মৃতি রোমন্থন করার ফুরসত মিলছিল না। কিন্তু কিছু স্মৃতি বোধ করি মস্তিস্কের নিউরনে ভাইরাসের মতো সুপ্ত থাকে, সুযোগ পেলেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কর্মব্যস্ততার ফাঁকফোকরে আমার ভেতরের সেই সুপ্ত কাফকার পোকাটি মাঝে মাঝেই নড়েচড়ে উঠত, জানান দিত তার অস্তিত্ব।
অবশেষে সুযোগ এল। পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির রিইউনিফিকেশন ডে আর সাপ্তাহিক ছুটি মিলে চার দিনের এক লম্বা ছুটি। কিন্তু আমার মনের ভেতর তখনো স্নায়ুযুদ্ধ। দ্বিখণ্ডিত মনের একপাশে ঘরকুনো আমি, যে নিজের কমফোর্ট জোনের বাইরে পা ফেলতে শিউরে ওঠে; অন্যপাশে এক যাযাবর কালপুরুষ সত্তা, যে অনবরত আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। মধ্যরাতের নিঃসঙ্গ নির্জনতায় আমার ভেতরের যাযাবর সত্তাটি একনায়কের মতো ক্ষমতা দখল করল। যুক্তির তোয়াক্কা না করে ত্রিশ মিনিটের ব্যবধানে আবিষ্কার করলাম, প্রাগের বাসের টিকিট আমার ইমেইলে জ্বলজ্বল করছে। ভীতু ঘরকুনো সত্তাকে সান্ত্বনা দিলাম—“টিকিট যখন কেটেই ফেলেছি, তখন একে নিয়তি বলে মেনে নেয়াই ভালো।” উদ্দেশ্য কেবল ভ্রমণ নয়, বরং প্রাহা বা প্রাগের অলিতে-গলিতে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় লেখকের আত্মার অনুসন্ধান।
জার্মানির ড্রেসডেন থেকে বাস ছাড়বে সকাল নয়টায়। কেমনিটজ থেকে ড্রেসডেন ঘণ্টাখানেকের পথ। সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি, প্রকৃতি যেন আমার যাত্রার জন্যই এক বিষাদগ্রস্ত ক্যানভাস সাজিয়ে রেখেছে। বছরের প্রথম তুষারের আচ্ছাদনে চারপাশটা সাদা কাফনের মতো ঢেকে দিয়েছে, আর আকাশটা মুড়ে আছে ভারী কুয়াশায়। এক অদ্ভুত আনন্দ-বেদনার মিশ্র অনুভূতি বুকে নিয়ে ড্রেসডেনের ট্রেনে চাপলাম।
ড্রেসডেনের বাসস্ট্যান্ডটা ঠিক আমার পরিচিত বাস স্টেশনগুলোর মতো নয়। জার্মানির বাস স্টেশন যদিও চিনিই আমি তখন দুইটা- ফ্রাঙ্কফুর্ট আর কেমনিটজ। ড্রেসডেনের বাসস্ট্যান্ডটা কিছুটা গোলকধাঁধার মতো। মূল ট্রেন স্টেশনের পাশের বেয়ারিশ স্ট্রিটটাই অঘোষিত বাসস্ট্যান্ড। রাস্তার দু’পাশেই একই রকম সব সাইনবোর্ড, যেন আয়নায় নিজেরই প্রতিবিম্ব। আমার বাস রাস্তার ঠিক কোন পাশে থামবে, তা নিয়ে এক বিভ্রান্তিতে পড়লাম। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করছে, হাতে মাত্র দু’মিনিট। শুনেছিলাম জার্মান ঘড়ির কাঁটায় আবেগ নেই, এক সেকেন্ডের হেরফেরও এরা সহ্য করে না। ইশারায় ও ইঙ্গিতে স্থানীয় এক পথচারীর কাছে জানলাম, আমি দাঁড়িয়ে আছি ভুল কিনারায়। বাস ছাড়বে উল্টোপাশ থেকে।
ইতিমধ্যে নির্ধারিত সময় থেকে দুই মিনিট গত হয়েছে। উল্টোপাশে কাঙ্ক্ষিত বোর্ডের নিচে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু বাসের দেখা নেই। আমি কি তবে বাস মিস করলাম? নাকি বাসই আসেনি? অস্তিত্ব সংকটের মতো এই আসা আর না-আসার দোলাচলে যখন দুলছি, তখন পাশের এক সহযাত্রী জানালেন- বার্লিন থেকে আসা বাসটি এখনো পৌঁছায়নি। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
বারো মিনিট পর বাস এল। যেন যান্ত্রিক সভ্যতার বুকে সামান্য মানবিক ত্রুটি। বাস ছাড়তেই সুপারভাইজার চেক, জার্মান ও ইংরেজিতে— তিনটি ভাষায় ক্ষমা চাইলেন। আমাদের চৌদ্দ মিনিট বসিয়ে রাখার জন্য তাদের এই বিনয়! আমি মনে মনে একফালি হেসে বললাম, “কোন ব্যাপার নাহ। আমি একবার গাবতলী স্টেশনে ৫ ঘন্টা বসে ছিলাম বাস দেরী করার জন্য। আমরা এসবে অভ্যস্ত।” সুপারভাইজার মহিলা তা শুনে খুব একটা সন্তুষ্ট হলেন বলে মনে হলো না। উল্টো জিজ্ঞেস করলেন আমি চা-কফি কিছু চাই কিনা। ফ্রি তে পেলে কে চা খায়?
বাস ছুটছে হাজার বছরের পুরনো এলব নদীর তীর ঘেঁষে। এই নদী কেবল জলধারা নয়, এ যেন ইতিহাসের এক তরল সাক্ষী। সপ্তাদশ শতাব্দীতে রাজা ফ্রেডরিক আগস্টুস এই প্রাচীন নগরীর গোড়াপত্তন করেছিলেন। কত গীতিকার, স্থপতি আর শিল্পীর স্বপ্নের তুলিতে আঁকা এই নগরী। আবার এই নগরীই দেখেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা। টনকে টন বিস্ফোরক আর অজস্র মানুষের রক্তে ধুয়ে মুছে এই মাটি নিজেকে আবার পবিত্র করেছে, ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে জেগে উঠেছে। ধ্বংস আর সৃষ্টির এই অনন্ত চক্রের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখের পাতা ভারী হয়ে এসেছে, টের পাইনি। সম্বিৎ ফিরল সুপারভাইজারের ডাকে— আবারও কফির প্রস্তাব। বিনামূল্যের কফিতে না বলার মতো বিলাসিতা আমার নেই। অতএব, কফিই তথাস্তু।
রাস্তার সর্পিল বাঁক আর নতুনত্বের সম্মোহনে সময় যে কখন বাষ্প হয়ে উড়ে গেল, টেরই পেলাম না। একসময় নিজেকে আবিষ্কার করলাম প্রাগের ফ্লোরেন্স বাস স্টেশনে। বাস থেকে নামার পর মুহূর্তের জন্য মনে হলো, আমি যেন এক সদ্য ভূমিষ্ঠ নবজাতক, আর এই বাস স্টেশনটি এক প্রসূতিগার। আমার মস্তিষ্ক তখন শূন্য, চারপাশের সবকিছুই অপরিচিত। এই জনারণ্যে আমি এক অস্তিত্বহীন সত্তা, একটা নুড়ি পাথরও আমার নাম জানে না। ভিড়ের মাঝে এই যে হারিয়ে যাওয়া, এর মধ্যে এক অদ্ভুত মাদকতা আছে। এক্সিস্টেনসিয়ালিজমে যাকে বলে অ্যাবসোলিউট ফ্রিডম, অচেনা শহরে যেন সেই স্বাধীনতার স্বাদ পেলাম। অ্যাডভেঞ্চার যে কেবল গহন অরণ্য বা দুর্গম পাহাড়ে হয় না, কংক্রিটের জঙ্গলে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করাও যে এক রোমহর্ষক অভিযান, তা এই প্রথম অনুভব করলাম।
কিন্তু এই দার্শনিক ঘোরে মজে থাকার বিলাসিতা আমার নেই। ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে, হাতে সময় মাত্র পাঁচ-ছয় ঘণ্টা। এই নশ্বর সময়ের মধ্যেই আমার দেখা করতে হবে অনন্তের কারিগর, প্রিয় লেখক ফ্রানৎস কাফকার সাথে। শুরু হলো পদব্রজে যাত্রা; বা বলা ভালো ফ্ল্যানিউর হয়ে শহরের পথে পথে নিরুদ্দেশ হাঁটা।
বাস স্টেশন থেকে বেরিয়ে খানিকটা দ্বিধায় পড়লাম। গন্তব্য কোন দিকে? দিকভ্রান্ত নাবিকের মতো আমার একমাত্র কম্পাস তখন অফলাইনে সেভ করা গুগল ম্যাপ। ম্যাপ বলছে স্টেশনটি শহরের এক প্রান্তে, আর মূল শহর বা ডাউন টাউনের যেতে হলে বামে মোড় নিতে হবে। কিন্তু বামে মোড় নেয়ার পর আর যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হলো না। মানুষের ঢলই হয়ে উঠল আমার পথপ্রদর্শক। যেন এক অদৃশ্য নদী, আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলল তার গন্তব্যে। আমি শুধু সেই জনস্রোতে নিজেকে সঁপে দিলাম।
খানিকটা হাঁটতেই এক খোলা বাজার। সেখানে জীবনের পসরা সাজিয়ে বসেছে একদল। নিত্যপ্রয়োজনীয় হস্তশিল্প থেকে শুরু করে কামারশালায় পেটানো ধাতব এন্টিক। এই বাজারের কোলাহল পেরিয়ে গেলেই চোখের সামনে আকাশ ফুঁড়ে দাঁড়ায় কুচকুচে কালো এক মিনার— বিখ্যাত পাউডার টাওয়ার। পঞ্চদশ শতাব্দীতে নির্মিত এই মিনারটি ছিল প্রাগ দুর্গের তেরোটি প্রবেশদ্বারের একটি। শুরুতে একে ডাকা হতো নিউ টাওয়ার। কিন্তু সপ্তাদশ শতাব্দীতে এর পেটে জমা করা হলো বারুদ। সেই থেকে ধ্বংস আর সৃজনের দ্বন্দ্বে এর নাম হয়ে গেল পাউডার গেট বা বারুদের মিনার।
বারুদের গন্ধমাখা ইতিহাস পেরিয়ে আরেকটু এগোলেই ওল্ড টাউন স্কয়ার। এক বিশাল উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ, যেন সময়ের এক মহিল নাট্যমঞ্চ। চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে গোথিক স্থাপত্যের সব মৌন সাক্ষী। ঠিক মাঝখানে এক বিশাল ভাস্কর্য আকাশের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে আছে।
স্কয়ারের পূর্ব দিকে তাকালে চোখে পড়ে দ্বাদশ শতাব্দীর এক স্থাপত্য-বিস্ময়— চার্চ অফ আওয়ার লেডি বিফোর টিন। আশি মিটার উঁচু এর চূড়াগুলো যেন মাটির পৃথিবী থেকে ঈশ্বরের দিকে প্রার্থনা ছুড়ে দিচ্ছে। কী নিপুণ, কী ভুতুড়ে তার সৌন্দর্য! আজ এই লেখাটি লিখতে বসে মনে হচ্ছে, ভাগ্যিস সেদিন আমি ছিলাম এক আনকোরা পথিক। সদ্য বাংলাদেশ থেকে আসা এক তরুণের চোখে সেই দৃশ্য ছিল জাদুর মতো। আজ ইউরোপের পথে-প্রান্তরে ঘুরতে ঘুরতে প্রাচীন স্থাপত্য দেখলে মনে হয়— “এ আর নতুন কী?” অভিজ্ঞতার এই এক অভিশাপ; চোখের বিস্ময় কেড়ে নেয়, মনকে করে দেয় অনুভূতিহীন। কিন্তু সেদিন? সেদিন আমার চোখ ছিল কুমারী, অভিজ্ঞতা তাকে স্পর্শ করেনি। তাই ওল্ড টাউন স্কয়ারের সেই প্রথম দর্শনের শিহরণ আমি আজও হাড়ে-মজ্জায় টের পাই।
স্কয়ারের পশ্চিম পাশে টাউনহলের দেয়ালে ঝুলে আছে আরেক বিস্ময়— মধ্যযুগীয় অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ক্লক। আজ থেকে ছয়শত বছর আগেও মানুষ প্রকৌশলবিদ্যায় কতটা উৎকর্ষ সাধন করেছিল, তা ভাবলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। এটি সাধারণ কোনো ঘড়ি নয়, এ যেন মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্র সংস্করণ। ছয় শতাব্দী ধরে এটি পৃথিবীর সাপেক্ষে নক্ষত্র আর গ্রহের অবস্থান জানান দিয়ে যাচ্ছে। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আমার নশ্বর জীবনের তুচ্ছ পাঁচ ঘণ্টা আর দেয়ালের ওই ঘড়ির ছয়শত বছরের অনন্ত সময়— দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি অনুভব করলাম সময়ের আপেক্ষিকতা। কাফকার শহরে দাঁড়িয়ে মনে হলো, আমরা সবাই আসলে সময়ের হাতের পুতুল।
ওল্ড টাউন স্কয়ারের ঐশ্বর্য আর জ্যামিতিক সৌন্দর্যের ঘোর যখন চোখে লেগে আছে, ঠিক তখনই ইতিহাসের এক নির্মম সত্য এসে ধাক্কা দিল। সৌন্দর্যের নিচেই যে কদর্যতা লুকিয়ে থাকে, এ যেন তারই এক ধ্রুপদী উদাহরণ। চত্বরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে জন হুস-এর বিশাল ভাস্কর্য। এক নির্বাক ও নিঃসঙ্গ বিদ্রোহী। পঞ্চদশ শতাব্দীতে এই ধর্মীয় সংস্কারককে তার বিশ্বাসের ‘অপরাধে’ প্রকাশ্যে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। আগুনের লেলিহান শিখা তার শরীর ভস্ম করে দিয়েছে, কিন্তু তার আত্মা যেন আজও এই চত্বরের বাতাসে মিশে আছে।
শুধু জন হুস নয়, পায়ের নিচের এই পাথরগুলোও সাক্ষী এক বীভৎস ইতিহাসের। ১৬২১ সালে হোয়াইট মাউন্টেন যুদ্ধের পর, ঠিক এই স্থানেই ২৭ জন প্রোটেস্ট্যান্ট নেতাকে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল। ভাবা যায়? আজকের এই কলকলর মুখর স্কয়ারটি একসময় ছিল জল্লাদের মঞ্চ। একি জায়গায় ইতিহাস, শিল্প, আর নির্মমতার এমন সহাবস্থান পৃথিবীতে আর কটা আছে? সৌন্দর্য আর মৃত্যু এখানে হাত ধরাধরি করে হাঁটে। শুনেছি ডিসেম্বরে এখানে ক্রিসমাস মার্কেট বসে, আলোয় ভেসে যায় চত্বর। কিন্তু সেই আলোর নিচেও কি রক্তের দাগ দেখা যায় না? আপাতত সেই উৎসবের অপেক্ষা মুলতবি থাক। আমার গন্তব্য উৎসব নয়, বরং সেই প্রবাদপুরুষ যিনি আজীবন উৎসবের বাইরের মানুষ ছিলেন।
মৃত্যুর উপত্যকা টাউন স্কয়ার পেছনে ফেলে পা বাড়ালাম উত্তর দিকে। মানচিত্র বলছে, স্প্যানিশ সিনাগগের পাশেই একটা কাফকার ভাষ্কর্য আছে। মিনিট দশেকের হন্টন শেষে দেখা মিলল তার। হ্যাঁ, ফ্রানৎস কাফকা। তবে রক্তমাংসের মানুষ নন, ব্রোঞ্জ নির্মিত এক পরাবাস্তব অবয়ব। ভাস্কর্যটি অদ্ভুত। এক বিশাল মাথাবিহীন স্যুট পরা শরীরের কাঁধে দিব্যি চেপে বসে আছেন ছোটখাটো এক মানুষ— স্বয়ং কাফকা। ২০০৩ সালে জ্যারোস্লো রোনা এটি তৈরি করেন কাফকার ছোটগল্প _‘ডেসক্রিপশন অফ অ্যা স্ট্রাগল’-_এর আদলে। যেন নিজেরই এক অচেনা সত্তার ওপর ভর করে বা তাকে পদদলিত করে তিনি জগতকে দেখছেন। কাফকার এই ভাষ্কর্যটির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, আমি নিজেও হয়তো আমার অতীতের কোনো এক মৃত খোলসের কাঁধে চড়ে এই অজানা শহরে ঘুরছি।
কাফকার দ্বৈতসত্তাকে বিদায় জানিয়ে মিনিট পনেরো হাঁটতেই বাতাসের আর্দ্রতা জানান দিল সামনেই নদী। প্রথমে ভেবেছিলাম এ বুঝি আমার চেনা সেই এলব নদী, যা ড্রেসডেনের বুক চিরে বয়ে গেছে। পরে ভুল ভাঙল। এটি এলব নয়, বরং এলবেরই এক অভিমানী বোন ভল্টাভা। চেক প্রজাতন্ত্রের ধমনী। হেরাক্লিটাস বলেছিলেন, “একই নদীতে দুবার পা ফেলা যায় না।” কারণ জল গড়িয়ে যায়, সময়ও। ভল্টাভার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এই নদী কেবল জল বয়ে নিচ্ছে না, বয়ে নিচ্ছে প্রাগের হাজার বছরের সুখ-দুঃখের স্মৃতি।
নদীর পাড়টা বাঁধানো, অনেকটা ড্রেসডেনের মতোই— যেন দুই শহরের এক আত্মিক আত্মীয়তা। ওল্ড টাউন আর ওপারের লেসার টাউনকে ভালোবাসার সুতোর মতো বেঁধে রেখেছে বেশ কয়েকটি সেতু। তার মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ আর জৌলুসপূর্ণ হলো চার্লস ব্রিজ। চার্লস ব্রিজে ওঠার মুখেই এক বিশাল কালো রঙের তোরণ। গথিক স্থাপত্যের এক অসামান্য নিদর্শন, যেন সেতুর পাহারাদার। সেতু তো নয়, এ যেন পাথরের ওপর ভাসমান এক মেলা। দুপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে ত্রিশটি বারোক আর্কিটেকচারের ভাষ্কর্য— যেন নীরব বিচারকের দল তাকিয়ে আছে আমাদের মতো ক্ষণস্থায়ী পর্যটকদের দিকে। আর তাদের পায়ের নিচে? জনসমুদ্র। সেই ভিড়ের মাঝেই পসরা সাজিয়ে বসেছে গুচ্ছ গুচ্ছ ভাসমান দোকান। কেউ বিক্রি করছে হাতে আঁকা প্রাগের ছবি, কেউ বা অদ্ভুত সব গয়না। এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ি। পুণ্য আর পণ্য এখানে একাকার। এই কোলাহলের মাঝেও চার্লস ব্রিজ তার নিজস্ব মহিমায় একলা, যেন হাজার বছরের পুরনো এক বৃদ্ধ তার নাতিনাতনিদের হইচই দেখছে নিস্পৃহ চোখে।
দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সন্তের মূর্তির দিকে তাকিয়ে হাঁটছি আর ভাবছি এরা কত শত বছর ধরে নির্বাক দৃষ্টিতে মানুষের আসা-যাওয়ার সাক্ষী? ঠিক এমন সময় জনস্রোত ঠেলে আমার সামনে এসে দাঁড়াল এক ব্রিটিশ যুবক। বেশভূষায় পর্যটক, কিন্তু চোখেমুখে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। যেন সদ্য কোনো জাহাজডুবি থেকে বেঁচে ফেরা নাবিক। ব্রিটিশ বুঝলাম তার উচ্চারণ শুনে। এক নিশ্বাসে সে তার ট্র্যাজেডির বয়ান বলে গেল— বুদাপেস্ট থেকে জুরিখের পথে ফ্লিক্স বাসে যাচ্ছিলো, কিন্তু প্রাগে বিরতির সময় তার ব্যাগটি বাসে রেখেই নেমেছিল, আর বাসটি তাকে রেখেই উধাও। টাকা, পাসপোর্ট, কার্ড সব বাসেই রয়ে গেছে। এখন সে নিঃস্ব, কপর্দকহীন।
সে আমাকে প্রস্তাব দিল- “আমাকে শুধু জুরিখের একটা টিকিট কেটে দাও, বিনিময়ে আমি তোমার জন্য যেকোনো কিছু করতে রাজি।” তার গলায় কি সত্যিই হাহাকার ছিল, নাকি ওটা নিখুঁত অভিনয়ের অংশ? হয়ত ছিল বা হয়ত না। কিন্তু আমার তখন দোটানায় ভোগার বিলাসিতা ছিল না। ব্লকড অ্যাকাউন্টের কঠিন গাণিতিক সূত্রে আমি তখন বাঁধা। তাকে না করে দিলাম। সে হতাশ চোখে ভিড়ে মিশে গেল।
চার্লস ব্রিজের পাথুরে শরীর পেরিয়ে পা রাখলাম মালা স্ট্রানা বা লেসার টাউনে। ওল্ড টাউনের আভিজাত্য এখানে অনেকটাই ম্লান, বরং অলিগলিতে লুকিয়ে আছে রহস্য। গুগল ম্যাপের নীল রেখা ধরে সোজা হাঁটলাম ভল্টাভার পাড় ঘেঁষে। গন্তব্য ফ্রানৎস কাফকা মিউজিয়াম। আর কত ধৈর্য সইবে? যার কলমের কালিতে নিজের বিপন্নতা খুঁজে পেয়েছি, তার স্মৃতিতে অবগাহন করার তৃষ্ণা তখন বুকের ছাতি ফাটিয়ে দিচ্ছে।
মিউজিয়ামের গেট দিয়ে চত্বরে পা রাখতেই এক অদ্ভুত দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম। সাহিত্যের গাম্ভীর্য আশা করেছিলাম, পেলাম এক চূড়ান্ত প্রহসন। আঙিনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে দুটি ব্রোঞ্জ নির্মিত পুরুষ অবয়ব। তারা পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নির্লজ্জের মতো মূত্রবিসর্জন করে চলেছে চেক প্রজাতন্ত্রের মানচিত্রের আকৃতিবিশিষ্ট এক অগভীর জলাশয়ে। চেক শিল্পী ডেভিড চের্নির এই ভাস্কর্যটির নাম পিস (Piss)। কী অদ্ভূত ব্যঙ্গ! জাতীয়তাবাদ আর রাজনীতির ওপর এ যেন এক নোনা জলের চপেটাঘাত।
কিন্তু ভাস্কর্যের চেয়েও বেশি কৌতুকপ্রদ হলো দর্শনার্থীদের আচরণ। একদল পর্যটক সেই কৃত্রিম প্রস্রাবের ধারার সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলার জন্য হুড়োহুড়ি করছে। কাফকা কি জানতেন, তাঁর বিষাদগ্রস্ত শহরের আঙিনায় একদিন এমন ডিজিটাল নির্লজ্জতা’র মেলা বসবে? মানুষের এই স্থূল বিনোদনের দৃশ্য দেখে মনে হলো, কাফকার উপন্যাসের মতোই জীবন আসলে এক অর্থহীন কৌতুক।
এই তরল প্রহসনের ঠিক সামনেই দুটি বিশাল রৌপ্যবর্ণের অক্ষর - ‘K’। অক্ষর দুটি যেন একে অপরের ঘাড়ে হেলান দিয়ে আছে। এই ‘K’ কি শুধুই কাফকা? নাকি তাঁর উপন্যাসের সেই হতভাগ্য চরিত্র ‘জোসেফ কে.’ যে আজীবন এক অদৃশ্য আদালতের বারান্দায় বিচার চেয়ে ঘুরেছে?
মিউজিয়ামের মূল ভবনে ঢোকার আগে ডানপাশে মিউজিয়াম শপ। উঁকি দিয়ে যা দেখলাম, তা এক বিশাল বাণিজ্যের সমারোহ। কাফকা, যিনি চেয়েছিলেন মৃত্যুর পর তাঁর সব লেখা পুড়িয়ে ফেলা হোক, আজ সেই কাফকাকে নিয়েই চলছে রমরমা ব্যবসা। টি-শার্ট, মগ, নোটবুক— সবখানে কাফকার সেই বিষণ্ণ মুখ। আর বই? হাজারখানেক তো হবেই। পরিসংখ্যান বলে, কাফকাকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রায় পনেরো থেকে বিশ হাজার বই লেখা হয়েছে, অথচ তিনি নিজে জীবদ্দশায় সামান্য কটি গল্পই ছাপতে পেরেছিলেন। ম্যাক্স ব্রড যদি বন্ধুর কথা শুনে পাণ্ডুলিপিগুলো সত্যিই পুড়িয়ে ফেলতেন, তবে আজকের এই দোকানটি অস্তিত্বহীন হতো, আর আমরাও বঞ্চিত হতাম এক মহাজাগতিক সাহিত্য থেকে। ইতিহাসের কী নির্মম রসিকতা— যিনি হারিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, পৃথিবী তাকেই সবচেয়ে বেশি খুঁজে বের করেছে।
টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করতেই বাইরের চনমনে রোদ দপ করে নিভে গেল। মিউজিয়ামের ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, যেন কোনো সমাধিসৌধ। বা হয়তো কাফকার মস্তিষ্কের নিউরনের ভেতর হাঁটছি। আবহসংগীত হিসেবে বাজছে এক ভুতুড়ে শব্দ, কখনো টাইপরাইটারের খটখট আওয়াজ, কখনো কাকের ডাক।
প্রদর্শনীটি দুটি অংশে বিভক্ত— এক্সিসটেনশিয়াল স্পেস এবং ইমাজিনারি টপোগ্রাফি । প্রথম অংশে কাফকার প্রাগ শহরকে দেখানো হয়েছে এক বিশাল খাঁচা হিসেবে। কাফকা লিখেছিলেন, “This little mother has claws”। প্রাগ তাঁকে আঁকড়ে ধরেছিল, ছাড়েনি আমৃত্যু। কাঁচের শোকেসে রাখা তাঁর হাতে লেখা চিঠি, ডায়েরির পাতা, আর বাবার সেই রাগী চেহারার ছবি। বাবার সাথে কাফকার সেই চিরন্তন দ্বন্দ্ব, সেই ভয়— সব যেন এই অন্ধকারের দেয়ালে ফিসফিস করছে।
সিঁড়ি বেয়ে যখন দ্বিতীয় অংশে নামলাম, মনে হলো এক দুঃস্বপ্নের জগতে পা দিয়েছি। লাল আলোর নিচে সারি সারি ফাইলের কেবিনেট। মনে পড়ে গেল দ্য ট্রায়াল বা দ্য ক্যাসেলের সেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কথা। মানুষ এখানে শুধুই একটা ফাইল নম্বর। বিশাল সব ড্রয়ার খোলা, যেন অদৃশ্য কোনো কেরানি আমাদের পাপ-পুণ্যের হিসাব কষছে। কোথাও বা টেলিফোন বাজছে কিন্তু কেউ ধরছে না। কোথাও বা আয়নায় নিজের মুখটিই বিকৃত হয়ে ধরা দিচ্ছে।
মিউজিয়ামটি এমনভাবে সাজানো যে, হাঁটতে হাঁটতে দম বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয়, কোনো অপরাধ না করেও আমি অপরাধী, কোনো বিচার ছাড়াই আমি দণ্ডপ্রাপ্ত। কাফকার গল্পের চরিত্ররা যে অ্যাবসার্ড পরিস্থিতির শিকার হতো, এই মিউজিয়ামের করিডোরে হাঁটলে সেই অসহায়ত্ব হাড়েহাড়ে টের পাওয়া যায়। বের হওয়ার সময় মনে হলো, আমি কোনো প্রদর্শনী দেখে বের হলাম না, বরং নিজের অবচেতনের এক অন্ধকার কুঠুরি থেকে মুক্তি পেলাম।
কাফকা মিউজিয়ামের সেই দমবন্ধ করা এক্সিসটেনশিয়াল কেভ থেকে যখন বের হলাম, তখন ফুসফুস হাপিত্যেশ করছে একটু খোলা বাতাসের জন্য। কাফকার জগত ছিল মাটির কাছাকাছি, সাধারণ মানুষের জগত। কিন্তু এবার গন্তব্য উল্টোদিকে— আকাশের দিকে, ক্ষমতার কেন্দ্রে। প্রাগ ক্যাসল বা প্রাগের দুর্গ।
কাফকার অসমাপ্ত উপন্যাস দ্য ক্যাসেলের নায়ক ‘কে’ আজীবন চেষ্টা করেও দুর্গের কর্তৃপক্ষের নাগাল পাননি, আমলাতন্ত্রের গোলকধাঁধায় পথ হারিয়েছেন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর পর্যটক হিসেবে আমার জন্য সেই পথ উন্মুক্ত, যদিও তা কম শ্রমসাধ্য নয়। মালা স্ট্রানার আঁকাবাঁকা পথ আর ওল্ড ক্যাসল স্টেয়ারস বেয়ে শুরু হলো আমার উর্ধ্বগমন। প্রতিটি সিঁড়ি ভাঙা যেন ইতিহাসের একেকটি স্তর পার হওয়া। যতই ওপরে উঠছি, লাল টালির ছাদগুলো নিচে পড়ে থাকছে, যেন আমি ধীরে ধীরে পার্থিব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক অলীক উচ্চতায় উঠে যাচ্ছি। শরীর পরিশ্রান্ত, কিন্তু মন এক অদ্ভুত জয়েচ্ছায় মত্ত। যে দুর্গে কাফকার চরিত্ররা ঢুকতে পারত না, আজ আমি সেই দুর্গের দুয়ারে।
অবশেষে চূড়ায় পৌঁছালাম। নবম শতকে প্রিন্স বোরিভোজের হাতে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত এই দুর্গটি কেবল একটি প্রাসাদ নয়, এ যেন এক মহাকাব্যিক শহর। গিনেস বুকের মতে এটিই পৃথিবীর প্রাচীনতম ও বৃহত্তম দুর্গ। চোখের সামনে আকাশ ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে আছে সেন্ট ভিটাস ক্যাথেড্রাল। এর গোথিক স্থাপত্যের চূড়াগুলো যেন ঈশ্বরের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে শাসন করছে।
দুর্গের প্রাচীরে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালাম। আহ, কী অবিশ্বাস্য সেই দৃশ্য! ভল্টাভা নদী এক রুপালি ফিতার মতো শহরটাকে জড়িয়ে রেখেছে। আর তার দুপাশে ছড়িয়ে আছে অগণিত লাল টালির ছাদ। এখান থেকে প্রাগকে মনে হয় এক খেলনা শহর। নিচ থেকে যে শহরটাকে মনে হয়েছিল রহস্যময় গোলকধাঁধা, ওপর থেকে তা মনে হচ্ছে এক সুশৃঙ্খল জ্যামিতি। শাসকের চোখ দিয়ে দেখলে পৃথিবীটা বোধহয় এমনই লাগে— ছোট, নগণ্য এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য। কাফকা নিচ থেকে যে অসহায়ত্ব দেখেছিলেন, ওপর থেকে তার কোনো অস্তিত্বই চোখে পড়ে না।
ক্ষমতার এই উচ্চশিখর থেকে এবার পতনের পালা। নামতে নামতে গন্তব্য ঠিক করলাম জন লেনন ওয়াল। আশির দশকে কমিউনিস্ট জমানার দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে এই দেয়ালটি হয়ে উঠেছিল চেক তরুণদের বাকস্বাধীনতার ক্যানভাস। জন লেনন নিজে কোনোদিন প্রাগে আসেননি, অথচ তার গান আর শান্তির বাণী হয়ে উঠেছিল এই শহরের অদৃশ্য স্লোগান। ভেবেছিলাম গিয়ে দেখব বিদ্রোহের সেই রংচঙে গ্রাফিতি, ছুঁয়ে দেখব ইতিহাসের সেই স্পন্দন। কিন্তু, নিয়তি এখানেও এক অদ্ভুত প্রহসন সাজিয়ে রেখেছিল। গ্র্যান্ড প্রিওরি স্কয়ারে পৌঁছে দেখি এক অদ্ভুত দৃশ্য। বিধিবাম! সংস্কার কাজের জন্য বা হয়তো আসন্ন উৎসবের তোড়জোড়ে আসল দেয়ালটি ঢেকে রাখা হয়েছে এক বিশাল ডিজিটাল প্রিন্টের পর্দা দিয়ে।
কী নির্মম পরিহাস! যে দেয়ালটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের, বিদ্রোহের এবং জ্যান্ত মানুষের হাতের ছোঁয়ার প্রতীক, তা আজ ঢাকা পড়ে গেছে এক যান্ত্রিক, ডিজিটাল প্রতিচ্ছবিতে। একদল পর্যটক সেই ডিজিটাল পর্দার সামনে দাঁড়িয়েই বিজয়ের হাসি হেসে ছবি তুলছে। আমার মনে হলো, আমি বোধহয় এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। এনালগ বিদ্রোহের যুগ শেষ, সামনে আসছে এক ডিজিটাল এবং স্পর্শহীন পৃথিবী। আসল লেনন ওয়ালটি হয়তো ইট-পাথরের নিচে চাপা পড়ে আছে, ঠিক যেমন চাপা পড়ে আছে আমাদের সত্যিকারের আবেগগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার ঝকঝকে পর্দার আড়ালে। এক বুক হাহাকার আর অদ্ভুত এক শূন্যতা নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। ভল্টাভা নদীর জলে অস্তগামী সূর্যের শেষ আভাটি যেন তরল সোনায় রূপ নিচ্ছে। এই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন প্রাগ তার দিনের জরাজীর্ণ পোশাক ছেড়ে রাতের মোহময়ী সাজে সেজে ওঠে। চারপাশের ক্যাফেগুলো থেকে ভেসে আসছে জ্যাজ সঙ্গীতের মৃদু লহরি, জ্বলে উঠছে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো। পর্যটকেরা এখন প্রস্তুতি নিচ্ছে রাতের প্রাগকে উদযাপনের। কিন্তু আমার জন্য এই উৎসব বরাদ্দ নয়। সিন্ডারেলা যেমন মধ্যরাতের আগেই তার জাদুর জগত ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল, আমাকেও তেমনি পালাতে হবে সন্ধ্যার আগেই।
ফ্লোরেন্স বাস স্টেশনে ফিরে এলাম। সেই একই জায়গা, যেখানে সকালে নিজেকে নবজাতক মনে হয়েছিল। কিন্তু মাত্র আট ঘণ্টার ব্যবধানে আমি এখন এক অভিজ্ঞ বৃদ্ধ। এই শহর আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে— কাফকার বিষাদ, ইতিহাসের নির্মমতা, আর জন লেননের নকল দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে একমুঠো দীর্ঘশ্বাস।
বাস ছাড়ল। জানলার কাঁচে শেষবারের মতো প্রাগের আলো-আঁধারির খেলা। বাস যখন হাইওয়েতে উঠল, পেছনে ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে আমার স্বপ্নের শহর। মনে পড়ে গেল জীবনানন্দ—“সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন…”। আমারও আজ লেনদেন শেষ। তবে এ কি শুধুই লেনদেন?
বাসের সিটে গা এলিয়ে দিয়ে ভাবলাম, একদিন হয়তো সব হবে। একদিন হয়তো এই জার্মান মুলুকেই বা অন্য কোথাও আমার ব্যাংক ব্যালেন্সের অঙ্কটা স্ফীত হবে। তখন হয়তো বিলাসবহুল কোনো হোটেলে রাত কাটাব, ভল্টাভার বুকে ক্রুজ ডিনারে শ্যাম্পেন গ্লাসে চুমুক দেব। কিন্তু তখন? তখন কি এই আজকের আমিটাকে খুঁজে পাব? অর্থ হয়তো আসবে, কিন্তু সময়? সময় তো একমুখী নদীর স্রোত। ২০১৯ সালের এই পড়ন্ত বিকেলে, কোভিডের ঠিক আগের এই নিষ্পাপ পৃথিবীতে, এক তরুণের চোখে যে বিস্ময় ছিল, তা কি আর কোনোদিন ফিরবে? তখন হয়তো চোখে থাকবে অভিজ্ঞতার ছানি, মনে থাকবে জাগতিক ক্লান্তি। আজকের এই সস্তা স্যান্ডউইচ খেয়ে হেঁটে বেড়ানো দিনগুলোর যে রোমাঞ্চ, তা কি হাজার ইউরোর ডিনারে মিলবে?
মিলান কুন্ডেরা বলেছিলেন, মানুষের জীবন একবারই ঘটে, তাই এর কোনো রিহার্সাল নেই। এই যে আজ ফিরে যাচ্ছি, এই যাওয়াটাই চূড়ান্ত। ভবিষ্যতে যদি ফিরে আসিও, সে হবে অন্য এক আমি, অন্য এক প্রাগ। বাস ছুটে চলেছে ড্রেসডেনের পথে, অন্ধকারের বুক চিরে। কানে বাজছে ডেনভারের গান, আর মনে বাজছে এক অদ্ভুত দার্শনিক সান্ত্বনা— আমরা আসলে কোনো জায়গা থেকেই পুরোপুরি ফিরে আসি না, আমাদের সত্তার একটা অংশ চিরকালের জন্য সেই শহরের ধুলোয়, সেই নদীর স্রোতে, সেই কাফকার ক্যাসেলের সিঁড়িতে আটকা পড়ে থাকে।
বিদায় প্রাগ! আবার দেখা হবে, কিংবা হবে না। কিন্তু আমার অস্তিত্বের মানচিত্রে তুমি এক অবিনশ্বর ধ্রুবতারা হয়ে রইলে।
আজ এই লেখাটি যখন শেষ করছি, তখন ক্যালেন্ডারের পাতা অনেক উল্টে গেছে। মাঝখানে পৃথিবী দেখেছে এক মহামারী। সেই লেনন ওয়াল হয়তো আবার নতুন রঙে সেজেছে, কাফকার মূর্তির সামনে ভিড় বেড়েছে। কিন্তু আমার মনের অ্যালবামে সেই ২০১৯-এর প্রাগ আজও অমলিন, ঠিক যেমন কাফকার লেখাগুলো—সময়ের স্পর্শহীন।
ফিচার ছবিঃ František Zelinka

